বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ইন্টারপোলে নোটিশ জারির পর তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুবাই পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান। এ সময় দ্রুত তাকে ফেরত আনা হবে বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে জানান, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকে একটি ই-মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়েছে যে বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়েছে। তাকে অতি দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
বেনজীরের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৫-২০ সাল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক এবং পরে আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের সঙ্গে তার জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ২০২১ সালে র্যাব এবং বেনজীর আহমেদসহ কয়েকজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। ওই সময় ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট উল্লেখ করে, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০-এর বেশি গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে র্যাবের বিরুদ্ধে।
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও জমি দখল:
গোপালগঞ্জে প্রায় এক হাজার ৪০০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত ‘সাভানা ইকো রিসোর্ট প্রাইভেট লিমিটেড’ গড়ে তুলেন বেনজীর। এ ছাড়া পুলিশের সাবেক এই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা তার স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। সে সময় অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে অন্তত ছয়টি কোম্পানির খবর পাওয়া যায়।
এছাড়াও গাজীপুরে বনের জমি দখল করে গড়ে উঠা ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নামের একটি রিসোর্টের মালিকানায় যুক্ত হন বেনজীর। ডিএমপি কমিশনার হিসেবে প্রভাবশালী হওয়ার সুবাদে রিসোর্টের ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নেন তিনি।
বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ভাওয়াল রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা সেসময় জানান, ভাওয়াল রিসোর্টের ভেতরে ও প্রবেশমুখে বন বিভাগের ৬.৭৩ একর জমি রয়েছে। অর্থাৎ বনের বিশাল এই জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে ভাওয়াল রিসোর্ট। বন বিভাগের তথ্য মতে, ভাওয়াল রিসোর্টের দখল করা জমির মধ্যে রয়েছে ৪ নম্বর বরইপাড়া মৌজার ৩, ২৭৯ ও ২৭১ নম্বর সিএস দাগে ১১ বিঘা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন, বেনজীরের ক্ষমতার দাপটে সবাই ছিলেন নির্বিকার, নিরুপায়।
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের স্ত্রী জীশান মীর্জার আয়ের কোনো উৎস না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে তার নামে ২৪০ বিঘা জমি। রাতারাতি গৃহিণী থেকে ব্যবসায়ী বনে যাওয়া জীশান মীর্জার সম্পদের পরিমাণ স্বামীর চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ বেশি।
বেনজীর আহমেদ পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীনের পর চাকরির শেষ তিন বছরেই রিবারের সদস্যদের নামে কেনেন ৪৬৬ বিঘা জমি। ১৯টি প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হয়ে যায় পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী পরিবার।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অভিযোগপত্র বা চার্জশিট
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তার নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।
আদালতের পরোয়ানা
অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তার অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল। গত ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের আইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আপনার মতামত লিখুন :