৭ নভেম্বরকে বিপ্লব বললেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান স্বীকারে বিএনপির দ্বিচারিতা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ নভেম্বর, ২০২৬, ০৭:১২ বিকাল

কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ৭ নভেম্বরকে বিএনপি বিপ্লব হিসেবে উদ্‌যাপন করলেও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটির মধ্যে দ্বিচারিতা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক সুবিধা বিবেচনা করে বিএনপি ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আজ শনিবার রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ন ট্রেড সেন্টারে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে "সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান: বর্তমানের প্রেক্ষাপটে ফিরে দেখা" শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর উপলক্ষে এই সভার আয়োজন করা হয়।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘৭ নভেম্বরের ঘটনাকে বিএনপি বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন সৈনিকদের অংশগ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের সমর্থনে জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করা হয়েছিল। এতে আপত্তির জায়গা নেই। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি সৈনিকদেরও অংশগ্রহণ ছিল। এত বিস্তৃত জনসম্পৃক্ততা ও অর্জন থাকার পরও বিএনপি কখনো একে গণঅভ্যুত্থান, এমনকি বিপ্লব হিসেবেও স্বীকৃতি দিতে চায় না।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ ‘বাকশাল টু’ থেকে মুক্তি পেয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর রাজনীতি করার সুযোগ এবং বাক্‌স্বাধীনতার পরিসর উন্মুক্ত হয়েছে। এটি গণঅভ্যুত্থানের বড় অর্জন। কিন্তু বিএনপি সেই অর্জনকে যথাযথভাবে স্বীকার করতে চায় না।’

বিএনপির অবস্থানের সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, ‘৭ নভেম্বরের ঘটনায় জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে দলটি একক মালিকানা দাবি করতে পারে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের একক মালিকানা দাবি করার সুযোগ নেই। এ কারণে ৭ নভেম্বরকে বিপ্লব বলা হলেও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে স্বীকৃতি দিতে অনীহা দেখা যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে। এটি ইতিহাসের সুবিধাজনক ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা।’

এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি কিছুদিন আগে বলেছেন, তারা বিপ্লবে বিশ্বাস করেন না; তারা একটি বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক দল। অথচ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ৭ নভেম্বর বিপ্লব দিবস হিসেবে উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে এই বৈপরীত্যও প্রশ্ন তৈরি করে।’

১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গণতন্ত্র হত্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপকর্মের কারণে রাষ্ট্র বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। কিন্তু সেসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত না করেই জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন।’

কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের আলোচনা করার আগে দলটির বিরুদ্ধে ওঠা অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেন হাসনাত। তিনি বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। বিচার শেষে কারা অপরাধী, কারা অপরাধী নন, তা নির্ধারণ করবে আদালত ও বিচারব্যবস্থা। এরপর আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।’

হাসনাতের দাবি, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও মূল্যস্ফীতি কমেনি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে মূল্যস্ফীতি এক অংকে নামিয়ে আনার কথা বলা হলেও তা ১২ শতাংশের ওপরে রয়েছে। 

রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের মালিকানাবোধ তৈরি করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে হাসনাত বলেন, ‘মানুষকে এমন অনুভূতি দিতে হবে যে এই রাষ্ট্র তার নিজের। পার্শ্ববর্তী দেশ নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিলেও যেন একজন মানুষ নিজের দেশের নাগরিকত্ব ছেড়ে যেতে না চান। রাষ্ট্র নাগরিককে সেই মর্যাদা, অধিকার ও সুযোগ দিতে পারছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।’

বিএনপি সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন হাসনাত। তিনি বলেন, আগামী এক বছর প্রতিটি নীতিক্ষেত্রে বিএনপি সরকার ব্যর্থ হবে। প্রশাসন থেকে অর্থনীতি, বিভিন্ন খাতেই ব্যর্থতা দেখা যাবে বলে তিনি মনে করেন। তার এই বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘তখন বিএনপি নিজেদের ভুল বুঝতে পারবে। তবে তারেক রহমানের সামনে এখনো ইতিহাসের দেওয়া সুযোগ রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগানো উচিত।’

আলোচনা সভায় লেখক ও চিন্তক ইমরুল হাসান বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর আগে ও পরের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক ও সামরিক অভিজাতদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রের ভূমিকার প্রেক্ষাপটে দিনটিকে বিশ্লেষণ করতে হবে। ৭ নভেম্বরের অন্যতম তাৎপর্য ছিল, একদলীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। তবে এর মধ্য দিয়ে সরাসরি জনবান্ধব রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।’

জনগণের মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপি বারবার প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ যখনই কোনো গণঅভ্যুত্থান বা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তির সুযোগ পেয়েছে, বিএনপি তখনই সেই আন্দোলনের সুফল ভোগ করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণা করেছে দলটি।’ ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিএনপির রাজনৈতিক ভূমিকার মধ্যে এই প্রবণতা দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে দেখা হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক দীনতা রয়েছে। কোনো ঘটনার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ জড়িত থাকলে বিএনপি সেটিকে বিপ্লব বলতে দ্বিধা করে না। কিন্তু যে আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষকে স্বৈরাচার থেকে মুক্তি দেয়, সেই ঘটনাকে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চায় না। কখনো সেটিকে শুধু আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করে। যেকোনো রাজনৈতিক ঘটনার সুবিধাভোগী হয় বিএনপি। কিন্তু ঘটনার পর জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপির এই অবস্থান রাজনৈতিক দৃঢ়তার অভাব, বুদ্ধিবৃত্তিক সীমাবদ্ধতা নাকি হীনম্মন্যতা—তা দলটিকে বিবেচনা করতে হবে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।’

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদ সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দলটির শাসনামলের অপরাধের জবাবদিহি নিশ্চিত না করায় সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত পুনর্মিলনের বদলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে পরিণত হয়েছিল।’ বিএনপিকে একই ভুল দ্বিতীয়বার না করার আহ্বান জানান তিনি।

সারোয়ার তুষার বলেন, ‘১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল, বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা ছিল। বাকশাল তথা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বরের ঘটনা ঘটে।’

জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা গ্রহণের পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে রাজনীতি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এটাই তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত করার পর কিছু প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তিও সেখানে জায়গা পেয়েছিল। এর মূল্যও তাকে দিতে হয়েছে।’

১৫ আগস্টের পরের সরকারব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে সারোয়ার তুষার বলেন, ‘ওই সময় খন্দকার মোশতাক আহমদ ছিলেন একজন বেসামরিক রাজনৈতিক ব্যক্তি। তার নেতৃত্বে গঠিত সরকারেও আওয়ামী লীগের নেতারা ছিলেন। ২০ আগস্ট জারি করা সামরিক ফরমানেও সংবিধান বহাল রাখার কথা বলা হয়েছিল। অর্থাৎ সংবিধান বাতিল না করেই সামরিক ফরমানের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সংবিধান ও রাষ্ট্রের কাঠামো নিয়ে যখন আলোচনা হয়েছে, তখন সংবিধান বহাল রেখে একটি জুলাই ঘোষণাপত্র দেওয়ার সুযোগ ছিল।’ কিন্তু বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সেই উদ্যোগ আটকে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।